ভারতের ওপর শুল্ক চাপাতে ইউরোপকে চাপ যুক্তরাষ্ট্র

ভারতের ওপর শুল্ক চাপ

ভারতের ওপর শুল্ক চাপ

ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপে ইউরোপকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির জটিল পরিস্থিতি আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর ওপর চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত রপ্তানি শুল্ক আরোপ করে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios–এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওয়াশিংটন চাইছে ইউরোপ শুধু রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করুক তাই নয়, বরং রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করুক এবং রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির দায়ে ভারত ও চীনের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করুক।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ও চীন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে যাচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি কিছুটা হলেও টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি ভারত ও চীনের ওপর একই ধরনের কড়া শুল্ক আরোপ করে, তবে রাশিয়ার তেলের বাজার সংকুচিত হবে এবং মস্কোর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

গত ১৫ আগস্ট আলাস্কায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেন। পুতিন সাফ জানিয়ে দেন, যুদ্ধ থামাতে হলে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, ঝাপোরিজ্জিয়াখেরসন প্রদেশগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে নরম সুরে রাজি হলেও, ইইউ নেতারা এখনও এমন প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। হোয়াইট হাউসের ক্রমবর্ধমান অধৈর্যতার মূল কারণও এটিই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিধা

ইইউ দেশগুলো শুরু থেকেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ এখনও রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়লেও তারা সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার জ্বালানি ত্যাগে এখনো প্রস্তুত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা Axios–কে বলেন,

“ইইউ নেতারা চাইছে এই অযৌক্তিক যুদ্ধ দীর্ঘ হোক, আর সেই যুদ্ধের ব্যয় বহন করুক যুক্তরাষ্ট্র। তারা একদিকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, আবার অন্যদিকে ভারত ও চীনের মাধ্যমে রাশিয়ার তেল কিনছে।”

ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানো

রাশিয়া থেকে তেল আমদানির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র চলতি আগস্টের শুরুতে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের মোট রপ্তানি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত শুল্ক ভারতের রপ্তানি খাতকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, কেমিক্যালস এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি।

ইউরোপে বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা

মার্কিন বাজারে অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ভারতের ব্যবসায়ী মহল এখন ইউরোপকে বিকল্প রপ্তানি বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে। ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে আরও বড় অংশীদারিত্ব তৈরি করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়।

তবে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কাজ করছে। তারা চাইছে ইউরোপ যেন ভারতীয় পণ্যের ওপরও শুল্ক আরোপ করে, যাতে ভারত বিকল্প কোনো বাজার না পায় এবং রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয়।

ভূরাজনীতির নতুন চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং একটি বড় ভূরাজনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করতে চাইছে, অন্যদিকে ভারত ও চীনকে চাপ দিয়ে তাদের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

ভারত অবশ্য এই চাপকে কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের অগ্রাধিকার। রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল আমদানি ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, তাই বৈশ্বিক চাপ থাকলেও এই নীতি বদলানো কঠিন হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপকে আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দেয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। ভারত বাধ্য হয়ে হয়তো আরও বেশি করে এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজার খুঁজবে। পাশাপাশি, ব্রিকস (BRICS) জোটও এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হতে পারে, যেখানে ভারত, চীন এবং রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অন্যদিকে, ইইউ দেশগুলোও দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষাও তাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *